স্টাফ রিপোর্টার : মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপজেলার খালিয়া দক্ষিণপাড়া গ্রামে সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারের উপর চরম বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। দুর্বৃত্তরা ঘরবন্দী করে আগুন ধরিয়ে দেয়ায় এক নারী নিহত এবং তার স্বামী গুরুতর আহত হয়েছেন। নিহত অনিতা মণ্ডল (৫৮), আহত তার স্বামী আশুতোষ মণ্ডল (৬৩)।
আহত আশুতোষ মণ্ডল রাজৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জানান, সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই সারা দেশে সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঢেউ শুরু হয়। সেই ধারাবাহিকতায় তার গ্রামের জামায়াতে ইসলামী-সম্পর্কিত আনোয়ার উদ্দিন ও তার সহযোগীরা তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। প্রথমে আশুতোষ মণ্ডল ও তার স্ত্রীকে মারধর করে, পরে ঘরে আটকে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে দুজনই অগ্নিদগ্ধ হন। স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাদের রাজৈর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়, কিন্তু ৮ আগস্ট ২০২৪ তারিখে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অনিতা মণ্ডল মারা যান।
পরবর্তীতে অনিতা মণ্ডলের মরদেহ তার ছেলে তপন মন্ডল এর স্ত্রী ছেলে ও শ্বশুর বাড়ির লোকজন নিতে গেলে তার তাদের উপর ফের হামলা চালানো হয়। নিহতের ছেলে তপন মণ্ডলের স্ত্রী জানান, মরদেহ নিতে গেলে আনোয়ার উদ্দিন, মিন্টু খলিফা ও সিন্টু খলিফা নেতৃত্বাধীন একদল সন্ত্রাসী তাদের উপর হামলা চালায়। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
তপন মণ্ডলের স্ত্রী জানান, আনোয়ার উদ্দিন ও তার সহযোগীরা ১৫ বছর ধরে তাদের জমি-জমা দখল করে আসছে। ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখে আনোয়ার উদ্দিনের ছেলে ছিন্টু খলিফা তার ননদ কাকতি মন্ডলকে অপহরণ করে, যা ১২ ফেব্রুয়ারি উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে ১৫ মার্চ ২০২২ আনোয়ার উদ্দিনের গ্রুপ তার স্বামী তপন মণ্ডল ও দেবর স্বপন মণ্ডলের উপর হামলা চালায়। এতে স্বপন মণ্ডল নিহত হন, কিন্তু আজও সেই হত্যার বিচার মেলেনি।
এরপর একই গ্রামের আনোয়ার উদ্দিন গ্রুপ ও সালাম খান গ্রুপের সংঘর্ষে আনোয়ারের পক্ষের এক ব্যক্তি নিহত হলে, ২০ মে ২০২২ তারিখে বিনা কারণে তপন মণ্ডলকে সেই মামলার এক নম্বর আসামি করা হয়। বাধ্য হয়ে তিনি ৭ জুলাই ২০২২ তারিখে দেশত্যাগ করেন।
সরকার পরিবর্তনের পর আবারও আনোয়ার উদ্দিনের দল আশুতোষ মণ্ডল দম্পতির উপর হামলা চালিয়ে তাদের ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে আশুতোষ গুরুতর আহত এবং তার স্ত্রী অনিতা মণ্ডল নিহত হন। বর্তমানে আনোয়ার উদ্দিনের লোকজন তাদের বাড়িঘর দখল করে এলাকায় জামায়াতে ইসলামী ক্যাম্প স্থাপন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তপন মণ্ডলের স্ত্রী বলেন, “আমরা বহু বছর ধরে নির্যাতনের শিকার হচ্ছি। একে একে স্বামী, দেবর, শাশুড়ি— সবাইকে হারিয়েছি। আমাদের অপরাধ শুধু আমরা হিন্দু। আমরা কি এ দেশে বাঁচার অধিকার হারিয়েছি? আমরা আনোয়ার উদ্দিন খলিফা ও তার দলের বিচার চাই। সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর চলমান এই নির্যাতনের অবসান চাই।”
স্থানীয় প্রশাসন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে বলে জানা গেছে, তবে এ পর্যন্ত কোন গ্রেপ্তার বা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের খবর পাওয়া যায়নি। এলাকাজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সংখ্যালঘু পরিবারটি এখন নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে এবং সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছে।